হাম প্রতিরোধে করণীয় ও কি খেতে হবে

বসন্তের মতো হামও আমাদের পরিচিত একটি রোগ। একসময় বসন্ত রোগের প্রকোপ থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় বিলুপ্ত, কিন্তু হাম এখনো আমাদের সমাজে মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। এটি একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলেও সহজেই সংক্রমণ ঘটতে পারে।

সাধারণত শিশুরাই এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়, তবে বড়রাও এর বাইরে নয়। অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাভাবিক পুষ্টিসম্পন্ন শিশুদের জন্য হাম তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু পুষ্টিহীন বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে হাম ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক সময় এটি শিশুর মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

হামের লক্ষণ হিসেবে সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়। লক্ষণগুলো শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই, তবে সঠিক পরিচর্যা ও সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গের ওষুধ দেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়, যা জটিলতা কমাতে সহায়তা করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরোধ। নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুকে টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

হাম কী?

হাম ভাইরাসজনিত একটি রোগ। জার্মান মিজলস নামেও পরিচিত হাম। ঠিকমতো এ রোগের চিকিৎসা না করা হলে রোগী নানা জটিলতায় পড়তে পারে। তবে হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। শিশুরাই হামে বেশি আক্রান্ত হয় বলে এক বছর থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশুদের হামের ভ্যাকসিন দেওয়া যায়।

হামের উপসর্গসমূহ (লক্ষণগুলো যেভাবে ধাপে ধাপে দেখা যায়):

হাম সাধারণত হঠাৎ করে শুরু হয় না, বরং কয়েকটি ধাপে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। 

প্রাথমিক লক্ষণ (প্রথম ২–৩ দিন):

১) তীব্র জ্বর দেখা দেয়।

২) সর্দি-কাশি ও শরীরের ক্লান্তি অনুভূত হয়।

৩) শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ব্যথা লাগে।

চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ:

৪) চোখ লাল হয়ে যায়।

৫) চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে।

৬) হাঁচি, কাশি ও গলা ব্যথা হয়।

৭) নাক দিয়ে অনবরত পানি বা সর্দি পড়ে।

সাধারণ শারীরিক পরিবর্তন:

৮) খাবারে অরুচি দেখা দেয়, ফলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে।

র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি (৪–৬ দিনের মধ্যে):

৯) ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৪–৬ দিনের মধ্যে শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।

এটি সাধারণত কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মুখ, পেট, পিঠ, হাত-পা হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ লক্ষণ (কপলিক স্পট):

১০) মুখের ভেতরে গালের দিকে ছোট সাদাটে বা লালচে বৃত্তের মতো দাগ দেখা যেতে পারে, যাকে কপলিক স্পট বলা হয়—এটি হামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্দিষ্ট লক্ষণ।

শিশু ও বড়দের হাম

শিশুদের মতো বড়দেরও হাম হতে পারে। তাই এখন হামের প্রতিষেধক হিসেবে বড়দের জন্যও আছে ‘এমএমআর’ ভ্যাকসিন। এ ভ্যাকসিন দেওয়া না থাকলে হাম হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তবে, সাধারণত একবার হাম হলে দ্বিতীয়বার আর এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তবে সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে, কেননা হাম ছোঁয়াচে।

হামের লক্ষণ

হাম হলে প্রথমে জ্বর হয় ও শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে বা হালকা ব্যথা লাগে। প্রথম এক-দুই দিন অনেক তীব্র জ্বরও হতে পারে। চোখ-মুখ ফুলে উঠতে পারে। চোখ লাল হয়ে যেতে পারে, চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে এবং হাঁচিও হতে পারে। শরীরে র্যাশ বা ছোট ছোট লালচে গুটি/ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং দ্রুতই তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সময় বিশেষত শিশুরা কিছুই খেতে চায় না এবং ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।   

হাম হলে করণীয়

হাম হলে অবশ্যই চিকিত্সকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসক রোগীকে ভালোভাবে দেখার পর শনাক্ত করতে পারবেন আসলেই হাম হয়েছে কিনা। সাধারণত তিন দিনের চিকিৎসাতেই এই রোগের জ্বর ভালো হয় এবং সাত দিনের মধ্যেই হামে আক্রান্ত রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। হামে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। আর একটু পর পর ভেজা তোয়ালে/গামছা বা নরম কাপড় দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। রোগীর বেশি জ্বর হলে বমিও হতে পারে। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। এ ক্ষেত্রে ওষুধ খেতে হবে। তবে কোনো ভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।

বিশ্রাম ও পানি

হাম হলে রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হয়। এ সময় বাসা থেকে বের না হওয়াই ভালো। অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। আর স্বাভাবিক খাবারদাবারের পাশাপাশি রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবারও দিতে হবে।

চিকিৎসা না হলে

সময়মতো চিকিৎসা করানো না হলে হাম থেকে নিউমোনিয়া, কানে ইনফেকশন এমনকি মস্তিষ্কে ম্যালিডাইসিস রোগ হতে পারে। তাই হামের নিরাপদ চিকিৎসা করানো খুবই জরুরি।

হামের টিকা কত মাস বয়সে দিতে হয়

বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, ৯ মাস বয়সে শিশুকে প্রথম হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেয়া হয়। ১৫ মাস বয়সে দেয়া হয় দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা। এই দুই ডোজ টিকা শিশুকে হাম থেকে ভালোভাবে সুরক্ষা দেয়।

কেন দুইবার টিকা দেয়া হয়

প্রথম ডোজে বেশিরভাগ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ হয় না। তাই দ্বিতীয় ডোজ দিলে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়।

টিকা নেয়ার গুরুত্ব

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। টিকা না নিলে শিশুদের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। টিকা দিলে জ্বর, ফুসকুড়ি, নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

সবশেষে বলা যায়, হামকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সচেতনতা, সঠিক যত্ন এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে একটি শিশুকে এই রোগের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে।

Post a Comment

Previous Post Next Post